যদি পিতা বেঁচে থাকতেন- সুজাত মনসুর

প্রকাশিত:শুক্রবার, ২৬ মার্চ ২০২১ ১২:০৩

যদি পিতা বেঁচে থাকতেন- সুজাত মনসুর

২৬শে মার্চ বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। শুধু ২৬শে মার্চ নয় সারাবছরব্যাপিই নানা অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারি দল আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবাই সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। প্রবাসেও বাংলাদেশের মিশনগুলোসহ বাঙালিরাও এই মহতি ক্ষণটি পালন করতে কার্পণ্য করবে বলেও মনে করি না। কেননা, একটি দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন সবার ভাগ্যে হয় না। বিশেষ করে তা যদি হয় বাংলাদেশের মত দেশের। এ বছর শুধু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীই নয়, বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ উদযাপনও পালন করছি আমরা, যার সূচনা হয়েছে গত বছরের ১৭ই মার্চ। স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের যে মহাযজ্ঞ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাতে অংশ নিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বের বেশ ক’জন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। এই অনুষ্ঠানে ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিংয়ের এবং নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি। মোদির আগমণের বিরোধিতাও করছে কতিপয় ইসলামী রাজনৈতিক দল ও তাদের দোসরা। বিশেষ করে হেফাজতে ্ইসলামের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, যুদ্ধাপরাধী আজিজুল হকের ছেলে মামুনুল খুব খুববেশি সোচ্চার এ ব্যাপারে। তার মোদি বিরোধি উসকানিমূলক বক্তব্যের জের ধরে গত ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্পদ্রদায়ের লোকজনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে প্রায় ১০০টি বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটতরাজ ও মানুষের ওপর হামলা হয়েছে। এখনও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি, যদিও প্রধান আসামীসহ অধিকাংশ আসামীই গ্রেফতার হয়েছে এবং সরকার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে সবধরনের সহায়তা করছে।

সূবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের জন্য সরকার ইতোমধ্যেইবছরব্যাপি নানা কর্মসুচি ঘোষনা করেছে। ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মবার্ষিকীর দিন থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে জাঁকজমকপুর্ণ অনুষ্ঠানমালার। পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদল বিএনপিও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০’-এ ভূষিত করেছে ভারতীয় সরকার। মহাত্মা গান্ধীর মতাদর্শকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর পুরস্কারটি দেয় ভারত সরকার। দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশ যখন মুজিব বর্ষ উদযাপন করছে, ঠিক তখন বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে পেরে তারা গর্বিত।’ উল্লেখ্য, এ বছর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনাও আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে চল্লিশ বছর অতিবাহিত করছেন। সুতরাং ২০২১ সালটি বাঙালি জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়।

পাঠক আপনাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে কেন আমি শুরুতে ‘বিশেষ করে বাংলাদেশের মত দেশ’ বলে উল্লেখ করলাম। আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই, তাহলে যে চিত্রটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাহলো দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সরকারের শাসনামল। প্রথমে জিয়াউর রহমান তারপর সাত্তার, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও সেনাসমর্থিত তিন উদ্দিনের সরকার, যাদের ১/১১-এর সরকার বলেও চিহ্নিত করা হয়। মধ্যে একবার অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করার পর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঐ সময়কালে আমরা স্বাধীনতার রজতজয়ন্ত্রী পালন করেছিলাম। রজতজয়ন্তীতে যে তিনজন বিশ্বনেতা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে এ মুহুর্তে দু’জনের নাম মনে পড়ছে, ফিলিস্তিন স্বাধীরতা আন্দোলনের নেতা ইয়াসির আরাফাত ও দক্ষিন আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যে অপশক্তি ক্ষমতায় জেঁকে বসেছিল, তারা যদি এখনও বহাল থাকত তাহলে কি আমরা বাঙালিরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী এভাবে উদযাপন করতে পারতাম, মোটেই নয়। যেখানে বঙ্গবন্ধুৃর নাম, মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বণি ‘জয় বাংলা’ নিষিদ্ধের পাশাপাশি আমাদের জাতীয়তাই পাল্টে দেওয়া হয়। বাঙালি হয়ে যায় বাংলাদেশী। খলনায়ক হয়ে যায়, নায়ক। যুদ্ধাপরাধীরা হয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারিদেরও সংসদে বসার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু ইতিহাস এমনই, চাইলেই ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়া যায় না, বরং ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়, চলে আপন গতিতে।

বঙ্গবন্ধু আশৈশব একটা সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্ন পূরণের জন্য জীবনবাজি রেখেছেন। একটা স্বাধীন ভ‚খন্ড তৈরি করেছেন। মুক্তির সংগ্রাম অর্থাৎ সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি, তবে জীবন দিয়ে বাঙালি জাতিকে আরো মহিমান্বিত করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর এ আত্মত্যাগ বাঙালি জাতি ভুলে যায়নি, যখন সময়, সুযোগ ও নেতা পেয়েছে তখনই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়তবাদের আবরণে বাঙালিত্বকে বিসর্জন দেয়নি। জয় বাংলা শ্লোগান ভুলে যায়নি। আজকের বাংলাদেশ তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। বাঙালিরা যে কেবল ঘুরে দাঁড়িযেছে তা কিন্তু নয়, এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের মন্ত্র বলে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। তাইতো দেখি, যে মার্কিন দেশের পরারষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে তলাবিহিন ঝুড়ি বলে পরিহাস করেছিল, সেই দেশেরই শীর্ষ পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে ১০ই মার্চ প্রকাশিত এক কলামে প্রখ্যাত সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টোফার আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশকে অনুসরণ করার জন্য। শুধু কি তাই, এর আগে ২০১৮ সালে পাকিস্তানের সাংবাদিকরা ইমরাণ খানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে অনুসরণ করার জন্য। বাঙালিদের এই মহাপ্রাপ্তি মাত্র ১২ বছরের মধ্যে অর্জিত হয়েছে একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা, সাহস, দৃঢ় মনোবল আর পিতার মত অকৃত্রিম দেশপ্রেম আছে বলেই। যদি পিতা মুজিব আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে দেখতেন, কন্যা কিভাবে পিতার অপমানের প্রতিশোধ নেয়। কিভাবে মাত্র ১২ বছরে পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে কি দ্রæত অথচ নিঁখুতবভাবে এগিয়ে চলেন, অর্জণ করেন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। বেঁচে থাকলে পিতা অনুভব করতেন, প্রকৃত রক্তের উত্তরাধিকারি কি দৃঢ়প্রত্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করে প্রমাণ করেন, কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। পিতা যেমন বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ান, তেমনি কন্যা হয়ে উঠেন বিশ্বের মধ্যে একজন প্রেরণাদায়ী নেত্রী। তাইতো কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রেসিয়া স্কটল্যান্ড যথার্থ উচ্চারণ করেন, “আমাদের কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আমি তিনজন অসাধারণ নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করতে চাই। তাঁরা হলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন, বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোটলে ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।” করোনা মোকাবেলায় অসামান্য অবদানের জন্য এই তিনজনকে তিনি প্রেরণাদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পিতা মুজিব যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে দেখতেন, যে মুক্তিযোদ্ধা আর বীরাঙ্গানাদের যে অপরিসীম ত্যাগ ও আত্মদানে এইদেশ তাঁরা আজ অবহেলিত নেই। তাঁরা মাসে মাসে ভাতা পাচ্ছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই পাচ্ছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই গৃহ পাচ্ছে তা কিন্তু নয়। মুজিব কন্যা ঘোষণা দিয়েছেন, মুজিববর্ষে বাংলাদেশে কোন গৃহহীন াকবে না। হচ্ছেও তাই, ইতোমধ্যেই ৬৫ হাজারের ওপরে গৃহহীন পরিবারকে গৃহ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকীরাও সহসাই পেয়ে যাবে। পিতা মুজিব আরো যা দেখতেন, যে আমেরিকা চাউলের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে চুয়াত্তরে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল, সেই বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন। আজ ঘরে ঘরে বিদ্যু, আকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। ইউনিয়নে ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক। বছরের প্রথমদিনেই কোটি কোটি শিশুর হাতে পোঁছে যাচ্ছে বিনামূল্যের নতুন বই। মানুষের পরনে শুধু কাপড় আছে তাই নয়, আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় পোষাক রফতানিকারক দেশ। একটা দক্ষ শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার জন্য জেলায় জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, উপজেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান। পিতা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে দেখতেন, তাঁরই কন্যার হাতে শীর্ষ যুদ্ধপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। তিনি অনুভব করতেন, তাঁর আশৈশবের স্বপ্ন সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এখন কেবল সময়ের দাবি।

তবে পিতা মুজিব বেঁচে থাকলে যে বিষয়টি দেখে কষ্ট পেতেন তাহলো, নির্জে হাতে গড়া প্রানের সংগঠন আওয়ামী লীগের টপ টু বটম চলছে দুর্নীতিবাজ আর দুর্বৃত্তায়নের চাষ। সবাই রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত, যা আমাদের সকল অর্জণকে ¤øান করে দেয়। কন্যা শেখ চেষ্টা করেও দোষণ ঠেকাতে পারছেন না। যেভাবে পারেননি তিনি নিজে স্কাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে, চল্লিশ জনের মতো এমসিএকে দুর্নীতির দায়ে দল ও সংসদ থেকে বহিষ্কার করেও। দল ও প্রশাসনে দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়ন অতীষ্ঠ হয়ে আক্ষেপ করে অনেককিছুই বলেছেন, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি, হয়তো দেরি করেছিলেন বলে। জননেত্রী শেখ হাসিনাও চেষ্টা করছেন পিতার মত দুৃর্নীতি আর দূর্বৃত্তায়নের লাগাম টেনে ধরতে। আমি আশাবাদী তিনি তা পারবেন, তবে সময় লাগবে। কেননা, শত শত বছেেরর জঞ্জাল আর মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু একদিন অন্ধকারের পূব আকাশে দিনমণি উঠবেই। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। সবাইকে স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্ত্রী ও মুজিব শতবর্ষের শুভেচ্ছা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ