নষ্ট সমাজ নষ্ট রাজনীতি – তৌফিকুল আম্বিয়া টিপু

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ ২০২১ ০১:০৩

নষ্ট সমাজ নষ্ট রাজনীতি – তৌফিকুল আম্বিয়া টিপু

স্বাধীনতার ৫০ বৎসর প্রায় হতে চলল। আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকী। বিগত ৫০ বছবে আমাদের সমাজ ব্যবস্হার উন্নতি না অবনতি হয়েছে সেটা বলা মুশকিল তবে রাজনীতিতে যে আমাদের অধপতন হয়েছে সেটা নিশ্চিত। বাংলাদেশে কিছু দিন পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। আমি আমার ইউনিয়ন দিয়েই আপনাদেরকে উদাহরণ দিতে চাই।

 

আমার জন্ম সুনামগন্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নে। কয়েক সপ্তাহ আগে কোন এক সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করল যে মার্চ মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। আর সে খবর প্রচার হওয়ার সাথে সাথে ইউনিয়নের আবাল থেকে শুরু করে ৭৫ বছরের কাউকে কাউকে প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা আমরা দেখতে পেয়েছি। যেহেতু আওয়ামিলীগ সরকার ক্ষমতায়, তাদের প্রার্থীরা এগিয়ে। শুধু মাত্র আওয়ামিলীগ থেকে প্রায় ২০ জন প্রার্থীর নাম বাজারে এসেছে। সাথে বিএনপি থেকে ৭/৮ জন এবং সতন্ত্র থেকে ২/৩ জন, মোট ৩০ জনের মত প্রার্থী।এর কারন কি বলে আপনারা মনে করেন? আমাদের সমাজ ব্যবস্হা এবং রাজনীতি অধ:পতন এর জন্য দায়ী। আমাদের তৃনমুল পর্যায়ের রাজনীতিবিদরা করে যদি আমি সরকার দল থেকে যে কোন মুল্যে নমিনেশন পেয়ে যাই তবে আমাকে আর আটকায় কে, আমিই হব অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। সেই ধারনা শুধু যোগ্যদের নয় বরং যারা অযোগ্য তাদের এই ধারানাটি বেশী। সাথে আছে দলীয় পর্যায়ে নমিনেশন কেনা বেছার ব্যাপার। এটা গরুর হাটের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এখানে ধর দাম করে দাম হাকিয়ে বিকি কিনি হয়। সেটা হতে পারে কোটি টাকা পর্যন্ত, তবে সেটা নির্ভর করে কোন এলাকায় কোন নির্বাচন। আমাদের বৃহওর সিলেটে হলে দামটা একটু বেশী কারন সেখানে অসংখ্য অযোগ্য লোকের আনাগোনা। পয়সা আছে টাকা যা লাগে তা দিয়ে যোগ্য হওয়ার চেষ্টা করেন। বেশীরভাগ সময় এরা অকৃতকার্য হলেও, কিছু কিছু সময় উর্ধতন কর্তৃপক্ষ টাকার কাছে হার মানে।

আমি যে পরিবারে জন্মেছি, আমাদের পরিবারের একটা অতিথ ঐতিহ্য আছে। আমরা পারিবারিক ভাবে অনেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত। পরিবারের কেউ সরকারী দল আবার কেউ বিরোধী দলের সাথে সম্পৃক্ত ।আমরা কেউ পারিবারিক ভাবে কারো ব্যাক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করি না।যার যে দলের আদর্শকে পচন্দ , সে তার দল করতে পারে।পরিবারে এটাও আছে আবার কেউ কেউ রাজনীতি একেবারে পচন্দ করেন না।

আমি যদি শুরু করি পাকিস্তান আমল, আমার দাদার বাবার থেকে উনি ছিলেন একজন মাষ্টার উনার নাম ছিল সরফ মামদ, উনাকে সবাই সরফ মাষ্টার বলে চিনতেন। আমার দাদার নাম হাজী রন্গুম আলী। উনি পাকিস্তান আমলে মেম্বার ছিলেন। তবে পাকিস্তান আমলে এই পদের নাম মেম্বার এর পরিবর্তে সর্পান্জ বলা হত। আমার আরেক দাদা/নানার নাম হাজী তেরাব আলী( আউকালী)।দাদা / নানা দেয়ার কারন আমার বাবা উনার চাচাতো বোন বিয়ে করেন। সেই সুবাদে আমার নানার বাড়ী এবং দাদার বাড়ী একই।উনি ছিলেন অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। উনাকে উপজেলার বেশীর ভাগ লোক আউকালী বলে চিনতেন। এ হাজী তেরাব আলীর অবদান অত্র ইউনিয়নের সবজায়গায়। উনি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে, ইউনিয়নের যে সবচেয়ে পুরাতন হাই স্কুলের মধ্যে একটি আট পাড়া হাইস্কুল সেটার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। মেনেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৯ সালে সেই মেনেজিং কমিটির সভাপতি নিয়ে একটা দুর্ঘটনা সংগঠিত হয় এবং ৩জন লোক সে দুর্ঘটনাতে মারা যান।আমি সে দুর্ঘটনা নিয়ে কঁথা বলব না। যারা মারা যান আমি উনাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

 

সেই দুর্ঘটনাটি ছিল আলহাজ্ব তেরাব আলী এবং তখনকার চেয়ারম্যান জনাব সিরাজুল ইসলামের মধ্যে ক্ষমতার দন্দ। দুর্ঘটনার পর উনি সেই আটপাড়া হাইস্কুল ছেড়ে আমাদের গ্রামে আইডিয়াল হাইস্কুল নামে আরেক হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। উনি পর্বতীতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উনার আমলে আমাদের ইউনিয়ন বহু উন্নতি সাধিত হয়। উনি নির্বাচিত হয়েই প্রথম কাজটি করেন, ইউনিয়নের নিজস্ব কোন ভবন ছিল না, অন্যের জায়গায় একটা অফিস ছিল । সেই অফিসটি স্হানান্তর করে নিজস্ব জায়গায় উনার নিজস্ব অর্থে একটি ভবন নির্মান করে দেন। সেটা আজও বিদ্যমান ।
এবার আসেন আমার বাবা হাজী সাজ্জাদুর রহমান, উনি ছাত্র জীবনে রাজনীতির সাথে জরিত ছিলেন।

 

মহান মুক্তিযাদ্ধের সময় উনি ছিলেন তরুন। অংশ নিয়েছেন ছিলেন মহান মুক্তিযাদ্ধে। হয়তো মুক্তিযাদ্ধাদের তালিকায় উনার নাম নাই বা উনি এই অসংগতিপুর্ন তালিকায় উনার নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চাননি। তবে সক্রিয় ভাবে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন।
উনি বাংলাদেশ পরবর্তি একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদন্দিতা করে আমাদের ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমার পরম শ্রদ্বেয় চাচা সিরাজুল ইসলাম চাচার কাছে মাত্র কয়েকটা ভোটে হেরে ছিলেন, পরে উনি বিদেশ চলে যান। এক টানা ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বিদেশে থেকে আবার প্রথম দেশে ফিরে আসেন।এরপর আমাদের পরিবারের এক এক করে সবাইকে উনি বিশ্বের উন্নত দেশ আমেরিকাতে নিয়ে যান। এতে আমার চাচা ফুফু কেউ বাদ যাননি, সবাই বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। যখন আমরা আমেরিকাতে সেটেল্ড তার পর উনি উনার সেই চেয়ারম্যান হওয়া এবং জনগনের জন্য কাজ করা সেই মনোভাব মাথায় রেখে বিদেশের আরাম আয়েশের জীবন ত্যাগ করে আবার দেশে ফিরে আসেন।আবার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবং জয় লাভ করেন।

যেহেতু উনি বহু বছর বিদেশে ছিলেন সেহেতু উনি আমাদের দেশের কিছু কিছু রাজনীতিবিদের মত উনার মন মানসিকতা ছিল না। উনি সৎ এবং নিস্টার সাথে উনার দায়িত্ব পালন করেছেন।উনি যখন চেয়ারম্যান বাংলাদেশের জনগন তখন সৎ এবং নিস্টাবান শব্দ গুলো খুব একটা ভালোর চোখে দেখে না। কারন এ তিন চার দশকে আমাদের সমাজ এবং রাজনীতির আমুল পরিবর্তন আসে। সমাজে চাটুকারদের সংখা বেড়ে যায়, রাজনীতিতে গুনে ধরে, আমাদের জাতীর শিরায়,উপশিরায় দুর্নীতি ডুকে পরে। সেই সময়ে উনার মত সৎ এবং নিষ্টাবান একজন চেয়ারম্যান যিনি ধাপটের সাথে কাউকে তুয়াক্কা নাকরে পাঁচ বছব দায়িত্ব পালন করেন।

 

ইউনিয়নের জনগন সেটা ভালোর চোখে দেখেনি। কেন বললাম যে জনগন ভালোর চোখে দেখেনি কারন পরবর্তী নির্বাচনে আমার পরিবারের আরেক সদস্য জনাব হাজী রফিক মিয়া নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যখন আমি ব্যাক্তিগত ভাবে উনার কেম্পেইন করতে গেলাম, তখন আমি আমার পরিচয় দেই আমার বাবার নাম দিয়ে, আর তখনই আমি বুঝতে পারি যে ইউনিয়নের জনগন আমার বারার এই কঠুর নিয়ম কানুনের জন্য কিছুটা অসন্তুষ্ট । আমি এ বিষয়ে অনেকের সাথে কথা বলি। জানতে পারি উনি উনার আপন ভাইকেও স্বজনপ্রিতির উর্ধে রেখে সবার সাথে একই আচরন করেছেন। যে আচরন বর্তমান সমাজে একেবারেই বেমানান। আমাদের সমাজ চায় একজন অসৎ রাজনীতিবিদ যিনি তাদের কথামতো যে কোন বৈধ অবৈধ কাজে সহায়তা করবে। চাঁদাবাজী সন্ত্রাস সহ সব ক্ষেত্রে তাদের সাথে থাকবে।আমার বাবা ছিলেন ব্যতিক্রম । উনার আমলে ঘোষ দুর্নীতি সহ বিভিন্ন অসংগতি দুর করতে চেষ্টা করেছেন।উনি সুনামগন্জের শ্রেষ্ট চেয়ারমযান নির্বাচিত হন।

 

উনি ইউনিয়নের রাস্তাঘাট নির্মানে যতেষ্ট কাজ করেছেন। উনার সবচেয়ে বড় অবদান নিজস্ব অর্থায়নে এলাকায় স্হাপন করেন একটি কারিগরী বিদ্যালয় এবং কলেজ।যে প্রতিষ্টানটি বিনা বেতনে এলাকার সকল ছাত্র ছাত্রীদের কারিগরী শিক্ষায় লেখা পড়া করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। উনি যেহেতু উনার জীবনের বেশীর ভাগ সময় বিদেশে ছিলেন, উনি বুঝতে পেরেছিলেন দক্ষ শ্রমিকের বিদেশে কত চাহিদা তাই সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে এ প্রতিষ্টানটি নির্মান করেন।যে প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় অদুর ভবিষ্যতে অনেক ছাত্র ছাত্রীকে সাবলম্বী হতে সাহায্য করবে।
এবার আসি পরিবারের আরেক সদস্য জনাব হাজী রফিক মিয়া যিনি হাজী তেরাব আলী (আউকালী) সাহেবের সুযোগ্য সন্তান। উনি উনার বাল্যকাল থেকে গত ৫০ বছরের বেশী বিদেশে থেকে দেশের জন ইউনিয়নের জন্য কিছু করবেন সে প্রত্যাশায় বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন।

 

যেহেতু বিগত নির্বাচন ছিল দলীয় প্রতিকে এবং উনি বিএনপি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন সেই সুবাদে উনি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেন এবং সতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। উনি পরাজিত হওয়ার পরও ইউনিয়নের উন্নয়নে তার অবদান রেখেই চলেছেন। উনি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আরেকটি প্রাইমারী স্কুল নাম দেন হাজী রফিক মিয়া প্রাইমারী স্কুল। সাথে সাথে উনি একটি হাসপাতাল নির্মান করার অংগীকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সেই হাসপাতালের জায়গা নির্ধারন এবং নামকরন অলরেডি করা হয়ে গেছে।নাম আমিনা বেগম হাসপাতাল । আগামী কিছু দিনের মধ্যে হয়ত সেটা দৃশ্যমান হবে।আগামী নির্বাচনে উনি আবার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

 

এবার আসি আমি নিজে এলাকার জন্য কি করেছি বা করতে চাই। আমিও আমার পুর্ব পুরুষের কাজের সুত্রধরে এলাকায় শিক্ষা প্রসারে কাজ করতে চাই। সাথে সাথে গরীব দু:খী মানুষের পাশেও দাঁড়াতে চাই। এ লক্ষকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছি। আমার বাবাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।আমরা একটা ফাউন্ডেশন করেছি।নাম আম্বিয়া ফাউন্ডেশন। এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এলাকার যে কোন স্কুল বা কলেজের মেধাবী ছাত্র ছাত্রী আর্থিক অনুদানের আবেদন করতে পারে।

 

আমরা ইউনিয়নের প্রতেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমদের আবেদন পত্র পৌছে গেছে। যে কোন মেধাবী ছাত্র ছাত্রী সে তার নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্টানের মাধ্যমে আমাদের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে পারে।আমাদের ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা সেই আবেদন পর্যালাচনা করে অনুমোদন করে থাকেন। আমরা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় বৃত্তি দিয়ে থাকি।আমরা যে কোন দুর্যোগে গরীব দু:খী মানুষের পাশে সাধ্যমত সহায়তা করতে চাই। আমার ইচ্ছা অদুর ভবিষ্যতে আমার ইউনিয়নকে এবং উপজেলার প্রতেকটি ইউনিয়নকে এক একটা মডেল ইউনিয় হিসাবে দেখতে ছাই।

 

আমার পরিবারের আরো অনেক সদস্য আছেন যারা নিজ নিজ অবস্হান থেকে দলীয় অথবা নির্দলীয় ভাবে নিরবে কাজ করে যাচ্ছেন। আগামীতে সময় পেলে তাদের কার্যক্রমকেও আপনাদের সাথে সেয়ার করব।
আমাদের সমাজে আজকাল সৎ, যোগ্য নিষ্টাবান লোকের কদর কমে গেছে এবং অসৎ, অযোগ্য, চাঁদাবাজ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের কদর বেড়ে গেছে।

 

এ সমাজকে পরিবর্তন করতে হলে আমাদের তরুন সমাজ সহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একসাথে কাজ করতে হবে। গুনেধরা সমাজকে আবার গুন মুক্ত করতে হবে।তাই আসুন সবাই মিলে এক সাথে কাজ করি এবং নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যাই। আমরা আগামী নির্বচনে নির্বাচিত করি আমাদের যোগ্য নেতৃত্ব যার বলিষ্ট নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে সমাজ এবং রাজনীতি। ফিরে পাব আমাদের অতিথ ঐতিহ্য, সবার কাছে এ প্রত্যাশা ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ