হাইল হাওর-বাইক্কা বিল ও গোপলা নদীর সংকট ও করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

প্রকাশিত:বুধবার, ০৩ ফেব্রু ২০২১ ০৮:০২

হাইল হাওর-বাইক্কা বিল ও গোপলা নদীর সংকট ও করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

সুরমাভিউ:- ফিশারির নামে অবৈধ দখলে বিপন্ন হাইল হাওর। বাইক্কা বিল মাছের অভয়াশ্রম হলেও রাতব্যাপী মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে। সুস্বাদু মাছের জন্য প্রসিদ্ধ গোপলা নদী দখলদারদের কারণে প্রশস্ততা কমে এখন রুগ্ন খাল।


গোপলা নদীর গভীরতম ডহর ‘কলকলি’ এখন বিলীন হয়ে মানুষের বাড়িঘর। বড় হাওরের মাছের বিলগুলো এখন চাষের জমি। কোথাও বাড়িঘর।

হাইল হাওর-বাইক্কা বিল ও গোপলা নদীকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে হাইল হাওর এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করতে হবে। এখানকার বাস্তু ব্যবস্থা সংরক্ষণে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মঙ্গলবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ব জলাভূমি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন। শহরের চৌমোহনায় দেশের প্রথম সারির অনলাইন নিউজ পোর্টাল আইনিউজের মৌলভীবাজার অফিসের কনফারেন্স হলে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে দুই ঘন্টাব্যাপী “হাইল হাওর-বাইক্কা বিল ও গোপলা নদীর সংকট ও করণীয় শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এতে  সভাপতিত্ব করেন বাপা মৌলভীবাজার-এর আহ্বায়ক আসম সালেহ সোহেল। প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাপা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট বাপা-এর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম।

বক্তব্য রাখেন- প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আকমল হোসেন নিপু, রাজনীতিবিদ অজয় সেন,বিটিভির জেলা প্রতিনিধি ও আই নিউজ-এর সম্পাদক হাসানাত কামাল, যমুনা টিভির জেলা প্রতিনিধি আহমদ আফরোজ, সাংবাদিক আব্দুর রব রনজু, পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক রিপন দে, রাজনীতিবিদ হাসান আহমদ রাজা, ফটোগ্রাফার রণজিত জনি প্রমুখ।

আব্দুল করিম কিম বলেন, হাইল হাওরের দালিলীক আয়তন হচ্ছে ১৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পড়েছে ১০ হাজার হেক্টর। এর ভিতরে বিল রয়েছে ৫৯টি। তার মধ্যে ২০ একরের চেয় ছোট বিল ৩৯টি এবং ২০টির আয়তন ২০ একরের উপরে। হাওরের বাকি চার হাজার হেক্টর পড়েছে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়। সদর উপজেলায় রয়েছে হাওরের ৫৫টি বিল। এর মধ্যে ১০-১২টি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আসলে হাইল হাওর ছোট হতে হতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন এর পরিমাণ সাত হাজার হেক্টরেরও কম হবে বলে আমাদের ধারণা। হাওরের জায়গা কমে যাওয়ার অন্যতম কারন হচ্ছে হাওর ভরাট হওয়া ও ফিশারীর নামে অবৈধ দখল।

কিম বলেন, হাইল হাওর একসময় এত গভীর ছিল যে এখান দিয়ে স্টিমার চলত। শ্রীমঙ্গল শহরতলির উত্তর ভাড়াউড়ায় হাওর অভিমুখে জেটি ছিল। জেটির নামে সেই রোডের নাম এখন জেটি রোড।

আকমল হোসেন নিপু বলেন, পাখিসহ জীববৈচিত্র্যের আধার বাইক্কাবিল ও হাইল হাওর। কিন্তু ভরাট হয়ে অস্তিত্ব সংকটে বাইক্কাবিল। আছে ভূমি আগ্রাসীদের চোখ রাঙানি। চিতল মাছের জন্য বিখ্যাত বাইক্কাবিল লাগোয়া বড় গাঙ্গিনা। লিজের নামে সেই বড় গাঙ্গিনা দখল এবং বাইক্কা বিলের মাছ মেরে ফেলার পায়তারাও থেমে নেই। এসব হাওর, নদী ও বিল রক্ষায় সামাজিকভাবে সোচ্চার হওয়ার মত দেন আকমল হোসেন নিপু।

হাসানাত কামাল বলেন, গোপলা নদীর ‘কলকলি’ ছিলো এক সময় মাছের ডহর। কলকলি ছিলো আইঢ়, কৈ, শিং, সউল-গজার, পুঁটি, চিতল, বোয়াল ইত্যাদি মাছের জন্য বিখ্যাত। সেই কলকলিতে এখন গড়ে উঠেছে মানুষের ঘরবাড়ি। প্রশস্ত গোপলা নদী এখন সরু খাল। গোপলার বোয়াল, আইঢ় ও পাবদা ছিলো খুবই সুস্বাদু। সেই গোপলা হারিয়ে যেতে বসেছে। বড় হাওরও অস্তিত্ব সংকটে।

বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকেরা বলেন,১০০ হেক্টর জলাভুমির বাইক্কা বিলকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। কোন কোন মৌসুমে এই বিল ৩০০০ হেক্টর থেকে ১২০০০ হেক্টর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বাইক্কা বিলে রয়েছে মূলত শাপলা ফুল এবং প্রায় পাঁচ থেকে আট বছর পূর্বে রোপণ করা জলজ গাছ। এই বিলে প্রায় ৯০ প্রজাতির মাছ বাস করে। তবে এখানে শীতকালে আগত অতিথি পাখিদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ পর্যন্ত এই অভয়ারণ্যতে প্রায় ১৪১ প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৯ প্রজাতির ফিশ ঈগল উইন্টার, প্রায় ৪৫০০ ফুল্ভাস হুইসটলিং হাঁস সহ শীতকালে আগত হাঁসদের বিশাল বহর। এছাড়া এখানে নিয়মিত গ্রেট স্পটেড ঈগল সহ বিভিন্ন ধরনের পাখিদের দেখা মেলে। এখানে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দেখা কম মিললেও মেছোবাঘের দেখা পাওয়া যায়। তবে রাতের আঁধারে বাইক্কা থেকে মা মাছ শিকার ও চোরা পাখি শিকারীর উপদ্রব বাইক্কার জন্য হুমকী।

গোল টেবিল বৈঠকে বক্তারা হাইল হাওর-বাইক্কাবিল ও গোপলা নদী খনন ও দখলমুক্ত করতে সামাজিক আন্দোলন, স্মারকলিপি প্রদান, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে চাপ প্রয়োগের ওপর মতামত দেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ