সিনহা হত্যার চার্জশিটঃ মূল পরিকল্পনাকারী প্রদীপ

প্রকাশিত:সোমবার, ১৪ ডিসে ২০২০ ০৯:১২

সিনহা হত্যার চার্জশিটঃ মূল পরিকল্পনাকারী প্রদীপ

বহুল আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে র‌্যাব। অভিযোগপত্রে টেকনাফ থানার সাবেক বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, টেকনাফ থানা এলাকায় ওসি প্রদীপ ক্ষমতার অপব্যবহার ও বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে অবৈধ কর্মকাণ্ড, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নির্যাতনের মাধ্যমে টাকা আদায়, মাদক ব্যবসাসহ অপরাধের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছিলেন। তার এসব নানা অপকর্মের তথ্য ছিল মেজর সিনহা ও তার সহযোগীদের কাছে। সিনহা এসব তথ্য দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করে তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অপকর্মের বিষয়ে ওসি প্রদীপের বক্তব্য নিতে থানায় গেলে প্রদীপ সিনহা ও তার সহযোগীদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেন। না গেলে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে বলে হুমকি দেন। কিন্তু হুমকির পরেও সিনহা ও তার সহযোগীরা তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন।

এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে থানায় বসে ওসি প্রদীপ, বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও তাদের তিন সোর্স সিনহাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ওসি প্রদীপের অপকর্ম, সাধারণ মানুষকে নির্যাতনসহ নানা অভিযোগের বিষয়ে জানার পরও এবং সিনহা হত্যার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করা, দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ এনে কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অথবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে। এ ছাড়া সিনহার সহযোগী শিপ্রা দেবনাথ ও শহিদুল ইসলাম সিফাতের বিরুদ্ধে টেকনাফ ও রামু থানায় পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল সেগুলো প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে দায় মুক্তির বিষয়টি অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
কক্সবাজার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গতকাল সিনহা হত্যা মামলার ঘটনায় করা চারটি মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে র‌্যাব। অভিযোগপত্র জমা দেয়ার পরে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজধানীর কাওরান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সিনহা হত্যা মামলার ঘটনায় মোট চারটি মামলা হয়েছে। টেকনাফ থানার মামলাগুলোতে মাদক ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। টেকনাফ থানার মাদক মামলায় শহিদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। আরেকটি মামলায় সরকারি কাজে বাধা দেয়ার জন্য মেজর সিনহা ও সিফাতকে আসামি করা হয়। আর রামু থানার মামলায় মেজর সিনহার বন্ধু শিপ্রাকে আসামি করা হয়। ৯ জনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেছেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া। ইতিমধ্যে সবক’টি মামলার তদন্ত কাজ শেষ করে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে টেকনাফ ও রামু থানার তিনটি মামলায় যে অভিযোগ আনা হয়েছিল সেগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় এবং মামলার স্বপক্ষে কোনো সাক্ষী না পাওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি ছিল মেজর সিনহা মো. রাশেদের বড় বোনের করা হত্যা মামলা। এই মামলায় ২৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত করতে তদন্ত কর্মকর্তা মোট ১৩০ দিন সময় নিয়েছেন। মামলায় ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন টেকনাফ থানা পুলিশের, ৩ জন এপিবিএনের বরখাস্তকৃত সদস্য এবং তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি। ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। ১ জন আসামি কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক রয়েছে। এর বাইরে আরো দুইজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে ১২ জন তাদের দোষ স্বীকার করে অনুকম্পা চেয়ে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা আদালতে জবানবন্দি দেননি।
তিনি বলেন- তদন্ত কর্মকর্তা তার ১৩০ দিনের তদন্ত কাজে মোট ৮৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের আলামত, ডিজিটাল কনটেন্টসহ আরো কিছু বিষয় আমলে এনে ৩০২/২০১/১০৯/১১৪/১২০খ)/৩৪ সাধারণ ধারা ও ১২০ (খ) ধারায় চার্জশিট প্রদান করেছেন।
আশিক বিল্লাহ বলেন, এই মামলায় মূল যে বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা নজরে এনেছেন সেটি হলো এই মামলাটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কারণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন সাক্ষীর সাক্ষ্য, প্রত্যক্ষদর্শী, আসামিদের জবানবন্দি, আলামত, ডিজিটাল কনটেন্ট ও বিভিন্ন ধরনের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে নিশ্চিত হয়েছেন এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি ধামাচাপা ও ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ওসি প্রদীপের প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রে পরিদর্শক লিয়াকত আলী, পুলিশের সোর্স মো. নুরুল আমীন, মো. আইয়াজ ওরফে আয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিন এই ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেন। পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এস আই নন্দ দুলালের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এপিবিএনের তিনজন সদস্যের সহায়তায় এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। পরবর্তীতে মেজর সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করা ও ঘটনা প্রভাবিত করার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার কারণে এস আই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন আজাদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন জড়িত ছিলেন। তারা ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার জন্য ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতকে সহযোগিতা করেছে। এ ছাড়াও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও পলাতক সাগর দেব মেজর সিনহার গাড়ি থেকে মাদক উদ্ধারের নাটক ও পরবর্তীতে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি আবহ তৈরি করে।

আশিক বিল্লাহ বলেন, ৭ই জুলাই মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, শহিদুল ইসলাম সিফাত ও তাদের আরেক সহযোগী মুফতি টেকনাফের নিলীমা রিসোর্টে অবস্থান করে। একপর্যায়ে মুফতি চলে আসার পরে মেজর সিনহা ও তার টিম একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করার জন্য টেকনাফের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক ধরনের আন্তরিকতা গড়ে তুলেন। মেজর সিনহা ওসি প্রদীপ কর্র্তৃক নির্যাতন, ইয়াবা বাণিজ্য ও প্রদীপের নানা অপকর্ম সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। তাই তিনি এসব বিষয়ের ওপর একটি ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য ওসি প্রদীপের নানা অপকর্মের বিষয়ে একটি বক্তব্য নেয়ার জন্য ক্যামেরাসহ অন্যান্য সেটআপ ও তার টিমকে নিয়ে টেকনাফ থানায় ওসি প্রদীপের কাছে যান। কিন্তু ওসি প্রদীপ আগে থেকেই মেজর সিনহা সম্পর্কে জেনে যাওয়াতে এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে মেজর সিনহাকে নিষেধ করেন। এক পর্যায়ে ওসি প্রদীপ এই কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য তাদেরকে হুমকিও প্রদান করেন।

তিনি বলেন, মূলত ওসি প্রদীপের প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। দুটি কারণে এই ষড়যন্ত্রটি তারা করেছে। ওসি প্রদীপের মাদক বাণিজ্য, অপরাধের অভয়াশ্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা এবং মেজর সিনহা এসব বিষয়ে জেনে গিয়েছিলেন তাই এই বিষয়টি যাতে কর্তৃপক্ষকে না জানান এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে তাদেরকে হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু সিনহা ও তার সহযোগীরা তাদের ইউটিউব চ্যানেলের কাজ অব্যাহত রাখেন। এজন্যই ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকত, তাদের সোর্সসহ অন্যরা এ ধরনের ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন।

ঘটনার পর ওসি প্রদীপ ও কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবি এম মাসুদুর রহমানের একটি ভয়েজ রেকর্ড ভাইরাল হয়। ঘটনার সঙ্গে পুলিশ সুপারের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের এই মুখপাত্র বলেন, এই ঘটনার আগে থেকেই ওসি প্রদীপ সম্পর্কে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে এসব বিষয়ে পুলিশ সুপার জেনেও অত্যন্ত উদাসীন ছিলেন। পাশাপাশি এক সাংবাদিক ও স্থানীয় মানুষের ওপর প্রদীপের নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পরেও পুলিশ সুপার উদাসীন ছিলেন। এর বাইরে সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করা এবং ওই সময়ে মেজর সিনহার চিকিৎসার ব্যবস্থা না করার বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা আমলে এনেছেন। সার্বিক ঘটনার বিবেচনায় একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে এবি এম মাসুদুর রহমানের ঘটনা তদারকিতে ঘাটতি ছিল। তার পেশাদারিত্ব আচরণ এবং দায়িত্ব পালনে আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে তদন্ত কর্মকর্তা মনে করেন। তাই তার দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য একটি বিভাগীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন।
ঘটনার পরিকল্পনা কখন করা হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে সিনহা ও তার সহযোগীরা ওসি প্রদীপের বক্তব্য নিতে থানায় যান। এ সময় ওসি প্রদীপ তাদেরকে হুমকি দেন। হুমকির পরেও তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে। পরে ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকত ও তাদের তিন সোর্স মিলে টেকনাফ থানায় বসে গোপন মিটিংয়ের মাধ্যমে সিনহা ও তার সহযোগীদের হত্যার পরিকল্পনা করেন। ওসি প্রদীপ ওই গোপন মিটিংয়ে মেজর সিনহা ও তার সহযোগীদের ধ্বংস করার জন্য পরিদর্শক লিয়াকতকে নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তার অনুসন্ধানে দেখেছেন জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে লিয়াকত আলী ওই তিন সোর্সের সঙ্গে আবার দেখা করেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ প্রদান করেন। এই তিন সোর্স ও অন্যরা তাদের জবানবন্দিতে এসব কথা স্বীকার করেছেন।

আশিক বিল্লাহ বলেন, টেকনাফে ওসি প্রদীপের অপরাধের একটি অভয়াশ্রম ছিল। তার স্বেচ্ছাচারিতা, আইন অমান্য, মাদক ব্যবসা, মানুষকে জিম্মি করে নির্যাতনসহ আরো কিছু বিষয়ে মেজর সিনহা ও তার সহযোগীরা প্রদীপের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এসব বিষয়ে সকল তথ্য প্রমাণ তাদের কাছে ছিল। কিন্তু প্রদীপের বক্তব্য চাইলে তাদের হুমকি দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলে। কিন্তু তারা টেকনাফ না ছাড়াতে ওসি প্রদীপ প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সিনহা, সিফাত ও শিপ্রা যে সকল ডিজিটাল কনটেন্ট সংগ্রহ করেছিলো ঘটনার পর এসকল কনটেন্ট টেকনাফ থানাতে নেয়া হয়েছিল। ডিজিটাল কনটেন্টগুলো র‌্যাব উদ্ধার করেছে। এসব কনটেন্টের বাইরে শিপ্রা, সিফাত ও অন্যদের বক্তব্যে নিশ্চিত হওয়া যায় সিনহার ল্যাপটপে স্পর্শকাতর কিছু বিষয় ছিল যেগুলো ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতের জন্য অস্তিত্বের সংকট ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে আশিক বিল্লাহ বলেন, মেজর সিনহা সেনাবাহিনীর একজন কৃতিত্বপূর্ণ অফিসার ছিলেন। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সিনহা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পরও ওসি প্রদীপ যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটি জঘন্যতম একটি কাজ। এসব বিষয় সামনে এনে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। তিনি বলেন, মেজর সিনহা ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। তিনি একজন অমায়িক ও সদালাপী মানুষ ছিলেন। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছি তিনি বন্ধু তৈরি করতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। একটি পর্যটনভিত্তিক ভিডিও তৈরির জন্য তিনি টেকনাফে গেলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেই তিনি তাদের নিপীড়ন, জিম্মিদশা, অত্যাচারিত হওয়ার কথা জানতে পারেন। এ সকল বিষয় তাকে পীড়িত করে। তাই তিনি পর্যটনভিত্তিক ভিডিও তৈরির পাশাপাশি এসব নিপীড়নের বিষয়টিকেও আমলে নিয়েছিলেন। মেজর সিনহা ও তার সহযোগীরা থানায় গিয়েছিলেন কিনা এবং ওসি প্রদীপ তাদের কীভাবে হুমকি দিয়েছেন এ বিষয়ে জানার জন্য তদন্ত সংশ্লিষ্টরা থানার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির জন্য সেটি সংগ্রহ করা যায়নি। পরবর্তীতে আসামি ও বিভিন্ন সাক্ষীর সাক্ষ্যে এটি প্রমাণিত হয়েছে।

গত ৩১শে জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় সর্বমোট চারটি মামলা হয়। তিনটি মামলা করে পুলিশ বাদী হয়ে। আর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে ৫ই আগস্ট টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে এই চারটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। মামলার তদন্ত করেন র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম। অভিযোগপত্রে তিনি এই হত্যা মামলায় ১৫ জনকে অভিযুক্ত করেন। এরমধ্যে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এস আই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এস আই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।